মো:নাসির (বিশেষ প্রতিনিধি): ঢাকার ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমা আক্তার। বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় লেসেদ্রা আর্ট গ্যালারির উদ্যোগে ৪৬টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পেইন্টিং প্রতিযোগিতায় জিতেছেন সম্মানজনক পুরস্কার। সম্প্রতি তাঁর পালকে যুক্ত হয়েছে আরো একটি অর্জন, ‘কবি আবদুল হাই মাশরেকী স্বর্ণপদক’। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, গ্রিস, বুলগেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এই শিল্পীর একক চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। চিত্রশিল্পী নাজমা আক্তারের গল্প শোনাচ্ছেন স্বপ্নীল আর্য…

বাবার ছিল বদলির চাকরি, আর মা অসুস্থ থাকায় ছোটবেলা কেটেছে নানাবাড়িতে। গ্রামে তখনো বিদ্যুৎ যায়নি। খালার গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বইয়ে একটি ছবি দেখে আঁকতে শুরু করে মেয়েটি। আনমনে ছবি আঁকতে গিয়ে সাড়ে চার বছরের মেয়েটির গায়ে হঠাৎ কেরোসিনের কুপির আগুন লেগে যায়। গায়ের কাপড়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। মুখ ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছিল না। অবশেষে বাসার কাজের লোক বালতি থেকে পানি ঢেলে আগুন নিভিয়েছিল। ভর্তি হতে হয়েছিল হাসপাতালে। তিন দিন পর ঘটনাস্থল থেকে মামি উদ্ধার করেছিলেন কলম দিয়ে আঁকা একটি মেয়ের ছবি। ছোট্ট মেয়েটির এতটা পুড়েছিল যে জীবন নিয়েই ছিল সংশয়। হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে তিন মাস। ঘা শুকাতে লেগেছিল দেড় বছর। ছবি আঁকার নেশায় অগ্নিদগ্ধ হওয়া সেই মেয়েটিই আজকের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নাজমা আক্তার।

চিত্রশিল্পী নাজমা আক্তার চিত্রকর্মে পেয়েছেন আন্তর্জাতিক পুরস্কার। বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় লেসেদ্রা আর্ট গ্যালারির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সপ্তম লেসেদ্রা আন্তর্জাতিক পেইন্টিং ও মিশ্র মাধ্যম প্রতিযোগিতায় চিত্রকর্মের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন বাংলাদেশের এই গুণী চিত্রশিল্পী। লেসেদ্রা প্রদর্শনী কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনীতে বিশ্বের ৪৬টি দেশের শিল্পীরা অংগ্রহণ করেন।

গত ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে কবি আবদুল হাই মাশরেকীর ৯৮তম জয়ন্তী উপলক্ষে দুই দিন ধরে অনুষ্ঠানের সমাপনী অনুষ্ঠানে ‘কবি আবদুল হাই মাশরেকী স্বর্ণপদক’ লাভ করেছেন। নাট্যজন ও নির্মাতা শংকর সাঁওজালের কাছ থেকে তিনি এ সম্মাননা পদক গ্রহণ করেন।

১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে পেয়েছেন রশীদ চৌধুরী মেমোরিয়াল পুরস্কার। এর আগে ১৯৮১-৮২ সালে পর পর দুই বছর চিত্র অঙ্কনে অর্জন করেন শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। নাজমা আক্তার বলেন, ‘পুরস্কারের জন্য কাজ করি না। তবে পুরস্কার পেতে কার না ভালো লাগে? কাজের স্বীকৃতি পেয়ে ভালো লাগছে। ’

আর্ট কলেজে ভর্তির স্বপ্ন

গতানুগতিক পড়াশোনা তাঁর মোটেই ভালো লাগত না। ছোটবেলা থেকেই ছিল ছবি আঁকার নেশা। নিজে নিজেই পাখির ছবি, গাছ ও লতাপাতার ছবি আঁকতেন। ছবি আঁকার নেশা দেখে বাবা চেয়েছিলেন, মেয়েকে ঢাকার আর্ট কলেজে ভর্তি করিয়ে দেবেন। নাজমা আক্তার তখনো জানতেন না, আলাদা আর্ট কলেজ আছে। ‘শুধু ছবি আঁকব, পড়াশোনা নেই, শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম। ’ শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। প্রেক্ষাপট গেল পাল্টে। বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছিল হানাদাররা। ‘যুদ্ধের পর শুরু হলো আরেকটি সংগ্রাম। এটা খুব কাছ থেকে দেখেছি। খুব কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছে সেই দিনগুলো। ’

এরই মধ্যে ঘটল একটি দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনায় এক ভাই প্রাণ হারালেন। মা ও বড় ভাইয়েরা চাইতেন না, তিনি আর্ট কলেজে ভর্তি হোন। ম্যাট্রিকের পর কলেজে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ইন্টারমিডিয়েট পাসও করলেন। মা আর বড় ভাইদের ইচ্ছা, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোক। কিন্তু তাঁর মনে তখনো আর্ট কলেজে পড়ার স্বপ্ন। জেদ ধরলেন, ভর্তি হয়েই ছাড়বেন। বরাবরের মতো এগিয়ে এলেন বাবা, সম্মতি দিলেন। ভর্তি হলেন ঢাকার আর্ট কলেজে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ)। ভর্তির পর ঢাকায় আসেন ১৯৭৭ সালে। হোস্টেলে সিট পাওয়ার আগ পর্যন্ত ছয় মাস থেকেছেন সিদ্দিকবাজারে, পরিচিতজনের বাসায়। ঢাকায় এরই মধ্যে কেটে গেছে ৪০ বছর। গ্রাম ও শহর—দুটিই দেখার কারণে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন তিনি। জানান, তাঁর ছবি আঁকায় এটা খুব কাজে দিয়েছে।

পড়াশোনা ও কর্মজীবন

আর্ট কলেজের লাইফটা ভীষণ উপভোগ করতেন। একাডেমিক কাজের অংশ হিসেবে ছবি আঁকতে যেতে হতো আউটডোরে। কখনো শাহবাগের রমনা পার্ক, মিরপুর চিড়িয়াখানা, পুরান ঢাকার জিনজিরাসহ ঢাকার নানা জায়গায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ বা লাইব্রেরির সামনে বসেও ছবি আঁকতেন। নাজমা আক্তার ফিরে গেলেন হারানো দিনগুলোতে, ‘একবার যেতে হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান এফ রহমান হলের সামনে। তখন ওখানে বস্তি ছিল। বসে বসে বোর্ডে রংতুলিতে বস্তির লোকদের ছবি আঁকছিলাম। তখন কলেরা ছড়িয়ে পড়েছিল। আমার পেছনেই ছিল কলেরার দুই-তিনজন রোগী। তারা বমি করছিল। বিষয়টি জানার পর ভয় পেয়ে সেখান থেকে বোর্ড নিয়ে দৌড়ে পালিয়েছিলাম। ’

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই বসেন বিয়ের পিঁড়িতে। বিএফএ পরীক্ষা চলাকালীন পৃথিবীতে আসে একমাত্র ছেলে অনিন্দ্য রহমান। সেশনজট ও রাজনৈতিক কারণে মাস্টার্স শেষ করতে পাঁচ বছর লেগে গিয়েছিল। ১৯৮৭ সালে সরকারি আর্ট কলেজ থেকে লাভ করেন এমএফএ ডিগ্রি। তত দিনে ছেলে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। অনিন্দ্য ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় যোগ দেন চাকরিতে। ছেলেকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার জন্য ছেড়েছেন বেসরকারি সংস্থার চাকরি। ১০ বছর ছবি আঁকায়ও মনোযোগ দিতে পারেননি। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর ফুল টাইম ছবি আঁকা শুরু করেন। বাসার স্টোররুমকে বানিয়ে ফেলেন স্টুডিও। কলেজ থেকে ফেরার পরই ঢুকে পড়েন স্টুডিওতে। শিল্পচর্চায় নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন নিবিষ্ট অনুরাগে।

সাধনাই যাঁর সৃষ্টিকর্ম

চিত্রশিল্পী নাজমা আক্তার মূলত বিমূর্তধর্মী ছবি আঁকেন। শৈশব-কৈশোর কিংবা তারুণ্যের নানা স্মৃতি, জীবন ও প্রকৃতির নানা বিষয় তুলে আনেন তুলির আঁচড়ে। রঙের প্রয়োগে কখনো উজ্জ্বলতা, কখনো ধূসরতার খেলা। হয়ে উঠেছেন নিসর্গ ও জীবনের বিশিষ্ট রূপকার। তিনি বলেন, ‘দৈনন্দিন জীবনের টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা তুলে আনি চিত্রকর্মে। চেনাজানা জিনিস থেকেই ছবির বিষয়গুলো বেছে নিই। মানুষের বোধগম্য হবে না, এমন ছবি আঁকি না কখনো। ’ নাজমা আক্তার জানান, সময় পেলেই ছবি আঁকা তাঁর কাজ নয়। ছবি আঁকার জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখেন তিনি। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, গ্রিস, মালয়েশিয়া, বুলগেরিয়া, ভারত, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশে এই শিল্পীর একক চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া তিনি দেশ-বিদেশে ৩৪টি গ্রুপ চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। নেপাল, ভুটান, সিঙ্গাপুর, গ্রিস, ইতালি, সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সে চিত্র প্রদর্শনী এবং ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছেন। বুলগেরিয়ার সোফিয়ায় অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল আর্ট এক্সপোতে বিচারকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। দেশেও অনেক চিত্রপ্রদর্শনীতে বিচারক হিসেবে ছিলেন। ছেলে অনিন্দ্য রহমান ছবি আঁকার পেছনে সব সময় উৎসাহ দিয়েছেন, নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। সদ্য প্রয়াত ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, স্পেন প্রবাসী শিল্পী মনিরুল ইসলাম এবং বিভাগীয় শিক্ষক আবদুস সাত্তার তাঁর অনুপ্রেরণার উৎস।

সব্যসাচী নারী!

শিক্ষক, চিত্রশিল্পী, লেখক, শিল্প সমালোচক—নানা পরিচয় তাঁর বেলায় সমানভাবে প্রযোজ্য। তবে চিত্রশিল্পী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির অভ্যাস। নিয়মিত ডায়েরি লেখারও অভ্যাস রয়েছে। এ বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শিল্পকলা একাডেমি বের করেছে তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘বাংলাদেশের বহুমাত্রিক শিল্পকলা’। নাজমা আক্তার একজন শিল্পসমালোচকও। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখন কেউ সমালোচনা করতে পছন্দ করেন না। কিন্তু তিনিই প্রথম সাহস দেখিয়ে সমালোচনার অর্থেই সমালোচনা করেছেন!’

চিত্রকর্মই তাঁর প্রাণ

দীর্ঘদিন ছবি আঁকা থেকে বিরত থাকলে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন নাজমা আক্তার। রাত-দিন ছবি নিয়ে নিমগ্ন থাকেন। শুধু অঙ্কনে নয়, গ্যালারিতে ছবি টাঙানোর ব্যাপারেও নান্দনিকতা খোঁজেন। কারো অনুরোধে কোনো ছবি আবার আঁকেন না। অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি জানান, ‘আমার কাজটা আমাকেই করতে হবে। সুযোগ কেউ কাউকে উপহার দেয় না। উত্তরাধিকার সূত্রেও কেউ শিল্পী হয়ে ওঠে না। নিজের ইচ্ছা, তীব্র বাসনা আর চর্চা থাকলে শিল্পী হয়ে ওঠা সম্ভব। ’ কখনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ছবি আঁকেন না। খ্যাতির পেছনেও ছোটেন না কখনো। তাঁর মতে, ‘খ্যাতির পেছনে দৌড়ালে ছবি আঁকা হবে না। চিত্রকর্মের গুণগতমান ঠিক থাকলে যশ, খ্যাতি আপনা-আপনিই আসবে।’

আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিজয়ী চিত্রশিল্প
আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিজয়ী চিত্রশিল্প
Share