কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধিঃ শুক্রবার রাতে গাজীপুরের কালীগঞ্জের খ্রীষ্টান পল্লীতে ডাকাত সন্দেহে পাঁচ পুলিশকে আটকের পর তাদের ছাড়িয়ে আনতে কালীগঞ্জ-কাপাসিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও অফিসার ইনচার্জের নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ জনতার উপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও গুলি বর্ষনের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের লাঠি চার্জ ও ছোড়া গুলিতে কমপক্ষে চব্বিশ জন গ্রামবাসী আহত হয়েছে। আহত গ্রামবাসীদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ চারজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে এসময় তাদের ছয় সদস্য আহত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

সরজমিনে গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, শুক্রবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে পাঁচ ব্যক্তি উপজেলার তুমলিয়া ইউনিয়নের দড়িপাড়া গ্রামের খ্রীষ্টান পল্লীর শিকারী বাড়ীর মৃত বিমল দরেশের স্ত্রী মিনা ক্রুশের ঘরে জোর পূর্বক প্রবেশ করে পাঁচ হাজার টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। এসময় মীনা তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা পুলিশের লোক বলে জানায়। তাদের গায়ে পুলিশের পোষাক না থাকায় ও পরিচয়পত্র দেখাতে ব্যর্থ হলে বাড়ীর লোকজন ডাকাত ডাকাত বলে চিৎকার শুরু করে। তাদের ডাক চিৎকারে স্থানীয়রা এসে ঐ পাঁচ ব্যক্তিকে আটকের চেষ্টা করলে তারা বারান্দার একটি কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। পরে স্থানীয়রা কালীগঞ্জ থানা পুলিশে খবর দিলে এসআই নাজমুল হক সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতাকে নিয়ন্ত্রণে এনে বিষয়টির মীমাংসার চেষ্টা করে। রাত দশটার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ দত্ত ও ওসি মোঃ আলম চাঁদ ২০ হতে ২৫ জন পুলিশ নিয়ে কমান্ডো ষ্টাইলে উপস্থিত জনতার উপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও গুলি বর্ষন শুরু করে। পুলিশের লাঠির্চাজ ও ছোড়া গুলিতে দীনেশ রোজারিও’র পুত্র হৃদয় রোজারিও, অমল রোজারীও’র পুত্র অনিক রোজারিও, অনীল দরেশের স্ত্রী ধ্বনি, অরুন দরেশের স্ত্রী মন্দিরা, জেবিয়ার রোজারিও’র পুত্র প্লাসিড রোজারিও, সুবল রোজারিও’র পুত্র রাজীব রোজারিও, পঙ্কজ পালমার পুত্র পিয়াল পালমা, সুধীর গেেমজর পুত্র সত্য গমেজ সহ কমপক্ষে চব্বিশ জন গ্রামবাসী আহত হয়। আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ চারজনের অবস্থা গুরুতর। লাঠি চার্জ ও গুলির ঘটনা মোবাইলে স্থির চিত্র ও ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে পুলিশ স্থানীয়দের কমপক্ষে দশটি মোবাইল ফোন জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। আতঙ্কিত জনতা আত্মরক্ষায় ঘর বাড়ী ফেলে দূরে সরে গেলে এসআই জামিল উদ্দিন রাশেদ ও আমিনুর রহমান, কনষ্টেবল জিয়াউর রহমান, নজরুল ইসলাম, ড্রাইভার মোঃ মনির হোসেন এবং আনসার সদস্য মনির হোসেনকে সাথে নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও অফিসার ইনর্চাজ থানায় ফিরে আসেন। এসময় পুলিশ গ্রামবাসীদের দেখে নেয়ার হুমকি দেয় বলেও স্থানীয়রা জানায়। পুলিশ চলে গেলে গ্রামবাসী আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পাঠায়। এ ঘটনায় খ্রীষ্টান পল্লীতে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

মীনা ক্রুশ জানায়, রাত সাড়ে নয়টার দিকে অজ্ঞাত পরিচয় পাঁচ ব্যক্তি জোর পূর্বক আমার ঘরে প্রবেশ করে পাঁচ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিলে তাদের পরিচয় জানতে চাই। এসময় তারা নিজেদের পুলিশ পরিচয় প্রদান করলেও পরিচয়পত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়। এতে আমার সন্দেহ হলে আমরা ডাকাত বলে চিৎকার দিলে এলাকাবাসী এসে তাদেরকে আটকের চেষ্টা করে। এসময় তারা বারান্দার কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। আমরা থানায় খবর দিলে সার্কেল ও ওসিসহ ২০ হতে ২৫জন পুলিশ এসে অতর্কিত ভাবে উপস্থিত সবাইকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও গুলি বর্ষন করতে থাকে। লাঠির আঘাতে ও গুলি লেগে গ্রামের কমপক্ষে চব্বিশ জন আহত হয়। পুলিশের এহেন কর্মকান্ডে আমরা আতঙ্কিত ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। বিষয়টি আমরা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে অবহিত করেছি। এ ঘটনা গাজীপুরের পুলিশ সুপারকে অবহিত করার জন্য মোবাইলে ফোন দিলেও তিনি আমাদের ফোন রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে কালীগঞ্জ থানার ডিউটি অফিসার এএসআই মোঃ আমজাদ হোসেন জানান, গ্রামবাসী কর্তৃক পুলিশ সদস্য আটক বা উদ্ধার করতে যেয়ে গুলাগুলির ঘটনা সম্পর্কে আমি অবগত নই।

উপ-পরিদর্শক রাশেদ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মাদক উদ্ধার অভিযানে গেলে স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষ ঘটে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে সাদা পোশাকে অভিযানে বের হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি নিরব থাকেন।

অফিসার ইনচার্জ মোঃ আলম চাঁদ’র সাথে কথা বলার জন্য তাঁর মোবাইলে বারবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ না করায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।

কালীগঞ্জ-কাপাসিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ দত্ত জানান, মাদক উদ্ধার করতে গেলে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে মাদকসেবীরা আটক করে। খবর পেয়ে ওসিকে সাথে নিয়ে আমি ঘটনাস্থলে যাই। পরিস্থিতি খারাপ দেখে পুলিশ মৃদ লাঠিচার্জ ও শর্টগানের ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এসময় পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছে।

এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রাতে কর্তব্যরত চিকিৎসক কবির হায়দার জানান, মনে হয় কালীগঞ্জ থানা পুলিশের কয়েকজন সদস্য অভিযানে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন রাতে হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন এবং একজন ভর্তি হয়েছেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গণি ভূইয়া বলেন, আমি ঢাকায় ছিলাম। ফোনে খবর পেয়ে এলাকায় এসেছি। পুলিশের গুলিতে স্থানীয় কয়েকজন আহত হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। একজনের চোঁখে গুলি লেগেছে। দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ঘটনাস্থলে যেতে পারিনি। তবে এ ধরনের ঘটনা অনভিপ্রেত।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোঃ হারুন অর রশিদ’র সাথে এ ঘটনা সম্পর্কে কথা বলার জন্য মোবাইলে বারবার ফোন দিয়েও রিসিভ না করায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।

পুলিশের পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে খ্রীষ্টান নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন। বিকালে কার্ডিনাল পেট্রিক গমেজ সহ সম্প্রদায়ের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শণে এলে স্থানীয়দের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন বলেও তারা জানিয়েছেন।

Share